আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের ঘোষিত নতুন দণ্ডবিধি নিয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নতুন আইনে স্বামীদেরকে ‘হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত স্ত্রীকে প্রহার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
আইনটি কী?
২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ৯০ পৃষ্ঠার একটি নতুন ফৌজদারি কার্যবিধি অনুমোদন করেন। এতে ১১৯টি ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা যায়। তালিবান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি শরিয়াহভিত্তিক আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে।
স্ত্রীকে প্রহার প্রসঙ্গে বিতর্ক
আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, স্বামী অতিরিক্ত প্রহারের মাধ্যমে স্ত্রীর হাড় ভেঙে ফেললে বা দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন তৈরি হলে বিচারক স্বামীকে শাস্তি দিতে পারবেন। সমালোচকদের দাবি, এই ভাষ্য থেকে বোঝা যায়—হাড় না ভাঙা পর্যন্ত প্রহারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
অন্যদিকে, তালিবানপন্থী বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি ইসলামী শরিয়াহর আলোকে ‘সংশোধনমূলক শাস্তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং শারীরিক ক্ষতি হলে তা দণ্ডনীয়। তাদের মতে, কুরআনের সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতের আলোকে এই বিধান তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ধাপে ধাপে উপদেশ, বিছানা ত্যাগ এবং সর্বশেষ পর্যায়ে ‘মৃদু প্রহার’-এর কথা উল্লেখ রয়েছে।
এই ব্যাখ্যা নিয়েই মূলত মতভেদ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যেকোনো শারীরিক সহিংসতা নারীর অধিকার লঙ্ঘন। অন্যদিকে তালিবান প্রশাসন এটিকে শরিয়াহসম্মত পারিবারিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখছে।
বাবার বাড়িতে যাওয়া নিয়ে ধারা
আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া ও বৈধ কারণ ব্যতীত বারবার বাবার বাড়ি গেলে এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে কারাদণ্ড হতে পারে। এখানেও ‘অনুমতি’, ‘বৈধ কারণ’ ও ‘বারবার’ শব্দগুলো ব্যাখ্যার কেন্দ্রে রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এটি নারীর চলাফেরার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। সমর্থকদের মতে, এটি পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার বিধান।
মুরতাদ নারীর শাস্তি
আইনের আরেকটি আলোচিত অংশে বলা হয়েছে, ইসলাম ত্যাগকারী নারীদের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং নির্দিষ্ট ব্যবধানে বেত্রাঘাতের বিধান রাখা হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মত্যাগকে রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য হিসেবে দেখার যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। তালিবান প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আফগানিস্তান একটি ইসলামিক শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করছে এবং আইন সেই কাঠামোর মধ্যেই প্রণীত।
বিতর্কের কেন্দ্র কোথায়?
আফগানিস্তানের নতুন দণ্ডবিধি নিয়ে বিতর্ক মূলত দুটি দৃষ্টিভঙ্গিকে ঘিরে—
একদিকে শরিয়াহভিত্তিক আইনব্যবস্থার দাবি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড।
পশ্চিমা গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনটিকে নারীবিরোধী ও কঠোর বলে সমালোচনা করছে। তালিবান প্রশাসন বলছে, তারা ইসলামী নীতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।
আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা থাকলেও তালিবান প্রশাসন এটিকে শরিয়াহসম্মত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই আইন মানবাধিকার ও নারীর স্বাধীনতার আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এ জাতীয় আরো খবর..